অতীনের এক একদিন খুব মন খারাপ করে - সারাদিন কাজের নিয়মে কাটে। বাজার, দোকান অল্প স্বল্প দেশ দুনিয়ার খবর নেওয়া কাগজে , টিভিতে , মায়ের সাথে বহরমপুরে কথা বলা ফোনে আর মাঝে সাঝে টুসির সাথে, (টুসি অতীনের বড় দিদি বহরমপুরে মা ওর বাড়িতেই থাকে ) এই নিয়ে সকাল গড়ায় দুপুরে ..দুপুর বিকেলে আর বিকেল সন্ধ্যে। অতীন টিউশন করে বেশকয়েকটা ….বাড়ি বাড়ি গিয়ে …..চলে যায় মোটামুটি।
কিন্ত ওই সবের মাঝেই অতীন বুঝতে পারে বুকের মধ্যে কোথাও একটা মন খারাপ জমাট বাঁধে এক একদিন। আর যেই না হওয়া অমনি সেই বেয়াড়া খেয়াল টা মাথায় চাপে ….মনে হয়আজ বাড়ি যাবো না। টেবিলে ঢাকা দেওয়া রুটি তরকারি , বিছানার পাশে রিডিং ল্যাম্প , বাথরুমের জং ধরা মগ্ , আশাপূর্ণা দেবীর বইয়ের মাঝে লালচে হয়ে যাওয়া সুমেধার ছবি সবঅপেক্ষা করুক তার জন্য সবাই উতলা হোক তার জন্য মাকে মিথ্যে বলুক যে সে বাড়ি গেছে …..কিন্ত আদতে যাচ্ছে না
৭ই নভেম্বর এই রকম একটা দিন ছিল। টিউশনের পর বেরিয়ে রাসবিহারী এসে মেট্রো ধরবে এইরকমই হয় রোজ. বচ্চন ধাবার একটু আগে মোড়ের মাথায় দাঁড়ায় অতীন। যাবার কথা বাঁদিকেকিন্তু যায় না মাথার ভেতরের চৌখুপ্পিগুলোয় কি সব যেন এদিক ওদিক করে মনে হয় তার জ্বর এসেছে।.. কেমন গা গুলোয় অতীনের। অস্বস্তি সত্বেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশের দৃশ্য দেখতে থাকে ..এক বাবার হাত ধরে ছেলে চলেছে বাবা যায় ২ কদম তো ছেলে লাফায় চার অতীন কে রাস্তা পেরোতে হবে তার হাত তো কেউ ধরে নেই কাজেই এক ফাঁক দেখে নিজেই এলো এপারে। কানে এলো এক ছোকরা হকারের সুকৌশল বক্তব্য “ শেষ বেলার খরিদারি দিদি - ২০ টাকা ছাড়ান দিচ্ছি “ তাকিয়ে দেখে এক মাঝবয়সী মহিলা যার হাতে একটা লাল অন্তর্বাস। দরাদরিরমাঝেই অতীন লক্ষ করলো মহিলার মুখের ক্লান্তি আর কারুণ্য। বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারে না , এগিয়ে যায় মেট্রোর গেটের দিকে। কলেজে থাকতে অতীন কবিতা লিখতো তখন হলেএই বাবা ছেলে বা এই মহিলাকে নিয়ে দুচার লাইন মাথায় আসত।
আজকাল আর কিছু আসেনা।
অতীন টিকেট কেটে ফেললো মেট্রোর আর পরক্ষনেই কেমন অবাক হয়ে ভাবলো সে বাড়ি যাচ্ছে কেন যাচ্ছে? জানেনা অতীন ..আবার কেমন গা গুলোতে শুরু করলো অতীনের মনে পড়লোটিউশন বাড়ির ঠান্ডা ভেজিটেবলে চপটার কথা। ট্রেন আস্তে ১০ মিনিট , শেষ ট্রেন। অতীন বসে ভাবতে লাগলো এই যে বাবার হাতে ধরা শিশু , এই যে দরাদরি , এই যে তার গা গুলানো, বাড়ি না যেতে চাওয়া , মন কেমন এই সবের যোগফলই কি জীবন ? এই সবই কি নিজেরা গায়ে গায়ে জুড়ে জীবনের মানে তৈরী করে নাকি এর মাঝে মাঝের ফাঁকা, না দেখা, না পাওয়াগুলোই জীবনের আসল সত্যি রূপ। ৫ বছর আগে চলে যাওয়া বাবার কথা মনে পড়লো অতীনের আর ঠিক এই সমযা হুড়মুড় করে মুখের সামনে মেট্রোর দরজা খুলে গেলো।
ট্রেনে চড়ে বসলো অতীন। যদিও এখনো বুঝে পাচ্ছে না সে কেন বাড়ি যাচ্ছে না গেলে কি হবে ...কেন যাচ্ছে।
অতীনের প্রেম হয়েছিল সুমেধার সঙ্গে সে অনেক দিন আগে অতীনই একরকম পালিয়ে এসেছে , ভয়ে। কিসের ভয় সেটা আজ অতীন বুঝে উঠতে পারেনি। সামনের সিটে ঠিক সুমেধারমতো দেখতে একটা মেয়ে বসে আছে অতীন সবে একটু ভালো করে দেখছে অমনি আবার কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠলো বুঝলো ব্যাপারটা পাকিয়েছে কিছু
শেষ স্টেশনে নেমে অতীন সিটে বসে পড়ে বুঝতে পারে তার মাথা ঘুরছে। রিক্সায় বাড়ি যাবে মনে করে অতীন স্টেশনের বাইরে আসে আর ঠিক তখনি তার মনে পড়ে তার শেষ পারানির কড়িপকেটে থাকা শেষ ১০ টাকাটা সে খরচ করে এসেছে মেট্রো স্টেশনের টিকেট ঘরে। পকেটে তার শুধু একটা ২০০০ টাকার নোট। আজি পেয়েছে টিউশন বাড়ি থেকে। অতীনের আবার বমিপেতে শুরু করলো বুঝলো বাড়ি তাকে যেতেই হবে শরীরটা বিগড়েছে কিন্তু যায় কি করে ? আস্তে আস্তে শরীরের শক্তি কমে আসছে মাথাটা বেশীকরকম ঘুরছে। ২০০০ টাকার খুচরো না দিলেকেউ যে তাকে নিয়ে যাবে না।
ঘড়িতে ১০.১৫ অতীন গত ১০ মিনিট রিক্সা স্ট্যান্ডের পাশে গাছের তলায় বসে আছে। একবার ভাবলো চুপচাপ উঠে যায় রিক্সায় তারপর দেখা যাবে যা হয় হবে কিন্তু অর্ধ মাতালরিক্সাওয়ালাদের সাথে দিনের শেষে গোলযোগ করার শক্তিও নেই অতীনের।
একটা টিউব কল এ গিয়ে চোখে মুখে জল দিলো অতীন আর তারপর হাঁটতে শুরু করলো। মেট্রো স্টেশন চত্বর টা পেরোলেই জায়গাটা কেমন নিঃঝুম শান্ত। অতীন নিজের নিঃশাসের শব্দশুনতে পায় বোধহয় একটু হাঁপিয়ে যাচ্ছে। সব কিছু অগ্রাহ্য করে অতীন হেঁটে চলে বুকের কাছে ২০০০ টাকার নোট টা নিয়ে
২০০০ টাকার নোট যেটা চাইলেও সে খরচ করতে পারবে না। অতীন হাঁটে আর ভাবে বুকের কাছে ২০০০ টাকার নোটটাও তার সাথে বাড়ি যাচ্ছে কোনো কাজে না লেগে। অতীনের মাথাঘুরছে আবার।একটা বাড়ির রকে বসে পড়ে। বুকে হাত রাখে ছুঁয়ে দেখে ২০০০ টাকাটা আর তার ঠিক তার তলায় একটা স্পন্দনকে। তার মন ….যেটা এই হাজার টাকার মতো কাউকে দেওয়াযায়নি ..বদলে পাওয়া যায়নি কিছুই ..কারো থেকে।
প্রেমহীন নির্বান্ধব তেতাল্লিশ বছরের একলা অতীন উঠে দাঁড়ায় বাড়ির দিকে হাঁটে ..চৌধুরী ভিলা পেরিয়ে মাঠের প্রান্তে এসে দাঁড়ায় অতীন যেখান থেকে দিগন্ত দেখা যায়
অতীনের মনে হয় ওই বুঝি প্রান্তরেখা দেখা যাচ্ছে যার ওপারে গেলেই বুঝি দেখা হবে বাবার সঙ্গে , সুমেধার সঙ্গে, টুসির পেটে মরে যাওয়া বাচ্ছাটার সঙ্গে যে তার সঙ্গে হাত ধরে সেইরকমলাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ি ফিরবে। বুকের মধ্যে খালি খালি লাগে কেমন হঠাৎ যেন ২০০০ টাকার কথা ভুলে যায় অতীন , বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। শুনতে পায় ঘরের মধ্যে ফোনটা বাজছে ….মা বুঝি খোঁজ নিচ্ছে সে ফিরলো কিনা
আস্তে আস্তে পকেটে হাত ঢুকিয়ে চাবি বার করে অতীন।
No comments:
Post a Comment